বুধবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৬

পর্নোগ্রাফি : জীবন ধ্বংসের হাতিয়ার

পর্নোগ্রাফি কথাটির সাথে আমরা এখন বেশ পরিচিত। এর অর্থ হলো- যৌন উদ্দীপনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যৌনসংক্রান্ত বিষয়বস্তুর প্রতিকৃতি অঙ্কন বা পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা। সম্প্রতি নারীদেহ, নারীর রূপ-সৌন্দর্য, পোশাক-আশাক তথা নারীর সামগ্রিক যৌনতাকে উপজীব্য করে অকথ্য, অব্যক্ত, বিকৃত ও কুরুচিপূর্ণ যৌনতায়ভরা কতিপয় ওয়েবসাইটে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা দেখা যায়। এর আধুনিক নাম হচ্ছে ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফি। কিন্তু এই শব্দটিই যে আমাদের সন্তানদেরসহ গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে কলুষিত বা ধ্বংস করে দিচ্ছে সে বিষয়টি হয়তো কখনো চিন্তা করিনি। আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যদের রয়েছে নিজস্ব মোবাইল ফোন। আবার অনেকেরই রয়েছে একাধিক ফোন। অধিকাংশ ফোনেই রয়েছে মেমরি কার্ড ব্যবহার সুবিধা। ভাল ও মন্দ দুধরনের কাজেই মেমরিকার্ড ব্যবহার হয়। এর মাধ্যমেই খুব সহজে অন্যায় ও গর্হিত কাজে জড়িয়ে পড়া যে কারো পক্ষে খুবই সহজ। বিতর্কিত কাজ থেকে নিজেরা বিরত থাকলেও আমাদের সন্তানদের বিরত রাখছি কিনা সেটিও গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত।
কেননা, গত ১ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশননামের একটি সংস্থা বাংলাদেশ শিশু পরিস্থিতি: সংবাদ বিশ্লেষণ ও বিশেষজ্ঞ অভিমতশীর্ষক এক অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকায় স্কুলগামী শিশুদের প্রায় ৭৭ শতাংশ পর্নোগ্রাফি দেখে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেশে তৈরি এই পর্নোগ্রাফিগুলোয় যাদের ভিডিও দেখানো হচ্ছে, তাদের বয়স ১৮ বছরের কম। অনুষ্ঠানে সংস্থার শিশু সুরা কার্যক্রমের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ৫০০ স্কুলগামী শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, সুস্থ যৌন শিক্ষার বিপরীতে বিকৃত যৌন শিক্ষার মধ্যে বেড়ে উঠছে। সংস্থার গবেষণায় আরো দেখা গেছে, চারটি পদ্ধতিতে অশ্লীল ভিডিও তৈরি হচ্ছে।
এর মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি পর্নোগ্রাফির চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ঘিরে পর্নোভিডিও মানুষ বেশি দেখছে। যুক্তরাজ্যে ছেলেদের অনলাইনে প্রথম পর্নো ছবি দেখার গড় বয়স মাত্র ১১! আর ১৩-১৮ বছর বয়সী ৩ হাজার বালকের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, তাদের ৮১ শতাংশই অনলাইনে পর্নো দেখছে।২০১৩ সালে ঢাকার কয়েকটি স্কুলে পরিচালিত একটি বেসরকারি টেলিভিশনের পরিচালিত অপর এক জরিপে দেখা যায়, ‘স্কুল শিক্ষার্থীদের ৮২ শতাংশ ছেলেমেয়ে স্বীকার করে যে, তারা সুযোগ পেলে মোবাইলে পর্নো ছবি দেখে। প্রায় ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসে বসেই পর্নো ছবি দেখে। প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা মোবাইলের পেছনে ব্যয় করে। আর ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী জানায় তারা কেবল প্রেম করার উদ্দেশ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে।
বর্তমান প্রজন্মের জন্য বড় একটি ঝুঁকি হলো, অনলাইনে পর্নোগ্রাফি দেখা। বাস্তবে পাওয়া যায় না এমন আকর্ষণ ও চাহিদা মেটাতেই পর্নোগ্রাফি দেখছে বলেই গবেষণা থেকে জানা যায়। যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ১৯৫৫ সালে পর্নোগ্রাফি ও অশ্লীলতাকে সভ্যতার কালো দাগ বলে মন্তব্য করেছেন। জার্মানের একদল গবেষক বলেছেন, ‘নিয়মিত পর্নোগ্রাফি দেখলে মস্তিষ্কের একটি বিরাট অংশ সংকুচিত হয়ে কার্যক্ষমতা কমে যায়। প্রাপ্তবয়স্করা দোষীবিনোদন হিসেবে পর্নোগ্রাফি দেখে। অনেক অভিভাবকরা শিশুদেরকে দামি ফোন, ট্যাব ও সেগুলোয় ইন্টারনেট সংযোগ দিচ্ছেন। কিন্তু তারা কী কাজে এগুলো ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে খোঁজ খবর রাখা মৌলিক দায়িত্ব। পর্নোগ্রাফি দেখলে মুহূর্তে সে যৌনতার কল্পরাজ্যে ঘুরে বেড়ায়। মানবদেহে সুখানুভূতির অনুভূতি জাগায়। বিভিন্ন কৌশল ও নেতিবাচক চিন্তায় সে জর্জিত হয়ে বাস্তবে পরিণত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
অবৈধ পন্থায় এমন কর্মে লিপ্ত হতে গিয়ে লজ্জা হারিয়ে ফেলে। এর ফলে স্বাস্থ্যগত ও মানসিক সমস্যা সৃষ্টি হয়। এতে করে, শিশুদের যৌন জীবন ও ভবিষ্যৎ দাম্পত্য সম্পর্ক ধ্বংস হচ্ছে। পর্নো আসক্তি হলে-নৈতিক অবক্ষয়, যৌন নিপীড়ন, পারিবারিক কলহ, হতাশা, সামাজিক ও মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। রুচি বোধের অবনতি হয়, নিঃসঙ্গতা চেপে বসে, শারীরিক ক্ষতি হয়, সামাজিকভাবে হেয় হতে হয়, বৈবাহিক জীবনে নারী-পুরুষ একে অপরকে ঘৃণার চোখে দেখে এবং পরকালে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।
পর্নোগ্রাফি থেকে সন্তানদের দূরে রাখতে চেষ্টা করতে হবে। ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফির প্রায় শতকরা ২০ ভাগ অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে। প্রতি সপ্তাহে ২০,০০০-এর বেশি অপ্রাপ্তদের ছবি ইন্টারনেটে পোস্ট করা হয়।। সীমা লংঙ্ঘন ও মন্দ বিষয় থেকে আমাদের সন্তান ও তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষার জন্য পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট কতিপয় দায়িত্ব রয়েছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্বই মৌলিক ভূমিকা হিসেবে কাজ করবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পর্নোগ্রাফির সাথে সম্পর্কিত ২০০ শব্দের ওপর সংবরণ দেয়া আছে। কেউ ওই শব্দগুলো লিখে সার্চ দিলে সার্ভারে নোটিফিকেশন যায়। অনুমোদন ছাড়া ওই সব সাইটে ঢোকা যায় না।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের দিকে তাকালে দেখতে পাই, চীনে পর্নোগ্রাফি ব্যবস্থাপনা রয়েছে, সিঙ্গাপুরে নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে, মালয়েশিয়ায় সমাজোপযোগী ফিল্টারিং ব্যবস্থা, সউদী আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরব মুসলিম সমাজে নেতিবাচক সাইট ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং ইন্টারনেটভিত্তিক সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটসমূহ প্রবেশের অগ্রহণযোগ্য। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও নেতিবাচক সাইটগুলোকে সরকার কেন ফিল্টারিং করছে না সে প্রশ্ন থেকেই যায়। সরকারের বিরুদ্ধে কেউ কোন ধরনের কটূক্তি করলে বা বিতর্কিত কোনো ছবি পোস্ট করলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬, তথ্য ও প্রযুক্তি (সংশোধিত) আইন ২০১৩ প্রয়োগ করে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হলে অশ্লীল ছবি, ভিডিও পোস্টকারী ও পর্নোসাইট নিয়ন্ত্রণে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২-এ দণ্ডবিধির যে ধারা উল্লেখ রয়েছে তা কেনো বাস্তবায়ন করা হবে না? যথা শীঘ্রই ইন্টারনেট ব্যবহারে শৃঙ্খলা আনতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে যৌন সংবেদনশীলতা, পর্নো বই, সিডি, ভিডিও তৈরি ও প্রচার কিংবা ডাউনলোড করে যারা সরবরাহ করছেন তাদেরকে অনুসন্ধান করে বের করা উচিত।
মনে রাখতে হবে, নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি প্রবল আগ্রহ, পর্নোগ্রাফির অতিমাত্রায় সহজলভ্যতা, সন্তানদের কর্মকাণ্ডের ওপর অভিভাবকদের যথাযথ নজরদারি, প্রযুক্তির অসৎ ব্যবহার, ধর্মীয় অনুশাসন, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে আইনের বাস্তবায়ন ও ইন্টারনেট ফিল্টারিং না থাকা আসক্তির অন্যতম কারণ।
মাতা পিতার উচিত শিশুদের সঙ্গে বয়ঃসন্ধিকালের শুরুতেই অর্থাৎ ১০ বছর বয়সেই স্বাস্থ্যকর ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা শুরু করা। পর্নোগ্রাফি ব্যবহার আইন করে বন্ধের চেয়ে এর খারাপ দিকগুলো বুঝাতে সক্ষম হলে অবশ্যই ইতিবাচক কাজে সন্তানরা আগ্রহী হবে। ইন্টারনেট ব্রাউজার হিস্টোরী চেক করা। বিভিন্ন ওয়েবসাইট ব্রাউজিং করতে করতে অনাক্সিক্ষতভাবে কোনো পর্নো ওয়েবসাইট সামনে চলে আসতে পারে, তাই ওয়েবসাইট ব্লক করার পদ্ধতি জানতে হবে। কম্পিউটারের মনিটর এমনভাবে সেট করা যাতে বাসার সবাই তা দেখতে পায়।
সন্তানদের সাথে বন্ধুর মতো মিশে বিভিন্ন বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ও কোনো সমস্যার সমাধান দেয়ার চেষ্টা করা। শিশুদের খেলাধুলাসহ বিনোদানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। মা-বাবা যতই ব্যস্ত থাকুক না কেন সন্তানকে মানুষ করতে চাইলে তাদেরকে সময় দিতে হবে। কোনটি ভালো আর কোনটি মন্দ সে বিষয়ে পৃথক করার জ্ঞান শিক্ষা দিতে হবে। সন্তানের মোবাইল ফোন, সিডি, মেমরি, পেনড্রাইভ, ট্যাব, ল্যাপটপ, কম্পিউটার ইত্যাদি লুকিয়ে রাখছে কিনা বা পাসওয়ার্ড দিয়ে লক করা, অশ্লীলতার কাজে ব্যবহার সম্পর্কে খোঁজ রাখা।
রাতে কিংবা দিনের কোনো সময়ে একাকী ইন্টারনেট ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করুন। কোনো আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও সংরক্ষণ করছে কিনা তা খতিয়ে দেখা। এছাড়া পর্নোগ্রাফি সম্পর্কে ইসলামের দিক নির্দেশনাগুলো মানতে হবে। আল কুরআনে বলা হয়েছে -তাদের বলে দাও (হে মুহাম্মদ): আমার প্রতিপালক প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা, পাপকাজ নিষিদ্ধ করেছেন। (৭:৩৩)। মুসলিম শরীফের এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘কোনো পুরুষ বা নারীর উচিত নয় অপর কোন পুরুষ বা নারীর গোপনাঙ্গের দিকে দৃষ্টিপাত করা। এককথায়, নৈতিক মূল্যবোধের বিকল্প নেই।


শনিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৬

তুলির আঁচরে............



তুলি, গোবিন্দপুর গাঁয়ের এক দরিদ্র কৃষক মছির উদ্দিনের মেয়ে। ভাগ্যের  লিখনেই হোক কিংবা গৌড় গোবিন্দের অনুরোধেই হোক চোখ শীতল করা গাঁয়ের শ্যামলতার চাদরে মুড়িয়ে-ই বুঝি বিধাতা তাকে শ্যামলা রুপে সৃষ্টি করেছেএতে বাবা মছিরের কোনো আপত্তি নেই, কেননা দীর্ঘ পাঁচ-ছ’বছর ধরে সে একটি কন্যার জন্য বিধাতার কাছে কতো আকুতি-ই না করে আসছিল
লোকো-মুখে এ কথা আমরা সবাই শুনে থাকি যে, গাঁয়ের মানুষগুলো বড্ড সহজ সরল হয়েই জন্মায়, এ যেনো বিধাতার দেয়া এক অপার করুণা। তা-ই যদি হয়, তবে সে গাঁয়েরই মেয়ে তুলি সহজ-সরলা, মিশুক-চঞ্চলা প্রকৃতির হবে তা তো সকলেরই জানার কথা বৈকি।
ঠিক তা-ই, তুলিও ততটুকু শান্ত, যতটুকু না রইলেই নয়। পড়ার সময় পড়া আর খেলার সময় খেলা কথাটি কানে নিলেও কারো বিপদের সময় তা মানতে নারাজ সবে এগারো-য় পা দেয়া এই কিশোরীর, এতে যতই থাকুক না জমা সমুদ্রাধিক পড়া কিংবা না হোক দিনের পর দিন খেলার সাথীদের সাথে মিলন।
তাই তো মাঝে মাঝে তার স্বপ্নের গল্প শুনে অভিভূত হয়ে থাকে পাড়ার সকলে।

মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৬

যুদ্ধ কোনো সমাধানের নাম হতে পারে না.........

"যখন আমি হতাশ হই, তখন আমি স্মরণ করি সমগ্র ইতিহাসেই সত্য ও ভালবাসার জয় হয়েছে। দুঃশাসক ও হত্যাকারীদের কখেনা অপরাজেয় মনে হলেও শেষে সবসময়ই তাদের পতন ঘটে মনে রাখবেন সর্বদাই ।"
উক্তিটি যে দেশের অধিবাসীদের বিশেষভাবে মনে থাকার কথা, আজ তারা-ই এর বিরুদ্ধাচারণ করতে একটুও সংকোচবোধ করছে না ।
স্পষ্ট করে বলতে গেলে, আমার বুলির নিশানা আমাদের বন্ধুত্ব পূর্ণ প্রতিবেশী দেশ ভারতকেই ছেদ করছে। কারণ, উপরোক্ত উক্তিটি স্বাধীন ভারতের মহানায়ক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী (মহাত্মা গান্ধী)-র।

আজ ভারত ও তারই প্রতিবেশী দেশ পাকিস্থান যে বিষয়গুলোকে সামনে এনে পরস্পরের সাথে যৌক্তিক আলোচনার বিপরীতে ঝগড়াকে যুদ্ধের রুপ দিতে যাচ্ছে, তা কাশ্মীরের অসহায় জনগণের দুর্ভোগের চেয়ে কখনোই বড় হতে পারে না। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ৯৩ বছর আগে এর চেয়ে বহুগুণ বড় বিবাদ ঠেকানোর জন্য অন্যকে নয় বরং নিজেকে কষ্ট দিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী। তিনি অনশনের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা ঠেকিয়ে বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গিয়েছেন যুদ্ধ নয় একমাত্র ভালবাসা-ই পারে নদীর দুই প্রান্তের মানুষকে একত্রিত করতে।
আমার কেনো জানি মনে হয়, আজ যদি তিনি বেঁচে থাকতেন, তবে কাশ্মীর-সমস্যার কোনো কোনো একটা সুরাহ তিনি অবশ্যই করতেন।
শুধু তিনি একা নন। এই দুর্গমগিরি পথের পথিকদের অনেকের মধ্যে নেলসন ম্যান্ডেলা ও একজন । যিনি শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ সমস্যা নিরসনের জন্য নিজের জীবনের একটা বড় সময়কে কারাগারের মধ্যে হাসি মুখে কুরবানী দিয়েছেন। তাঁর মাধ্যমেই বিশ্ববাসী প্রথম বুঝেছিল কালো ও ধলো দুটি রঙ মাত্র, এটি কখনোই একটি জাতি বিভেদের ইস্যু হতে পারে না।
আমার মাথায় আসে না, ভারত ও পাকিস্থান এই সামান্য বিষয়টি কেনো বুঝতে পারছে না যে, মাইনাসকে যতবারই প্লাস(+) দ্বারা গুণ(x) করা হোক না কেনো তা থেকে কখনোই প্লাস(+) অর্থাৎ সফলতা আশা করা যায় না বরং গুণশেষ হিসেবে সর্বদাই মাইনাস(-) অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ ক্ষতির শিকার হতেই হবে এটা আপনি মানুন কিংবা না-ই বা মানুন।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা যেমন একদিকে চেঁচিয়ে বলছে এই দাঙ্গার ফলে দুই দেশের বিপুল পরিমাণ নিরহ জনগণ বলির ছাগল হবে তেমনি অন্য আরেকপ্রান্তে পরিবেশবিদরা বিলাপ করছে যে, এতে শুধু দুই দেশেরই ক্ষতি হবে না বরং এর প্রভাব পড়বে সারা পৃথিবীর জনগোষ্ঠীর উপরে।
এজন্য চাটুকারদের কথায় কান না দিয়ে উভয় দেশেরই উচিত হবে কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যকার যাবতীয় বিভেদের অবসান ঘটানো।
মনে রাখতে হবে যে, হিন্দু ও মুসলমান পৃথিবীর বুকে আলাদা কোনো জাতি নয় বরং দুটি ধর্ম মাত্র।

শুক্রবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৬

ক্ষমা করো ওমরান 

মিডিয়ার খবরে ভেসে উঠে
পাঁচ বছরের ওমরানের রক্তস্নাত শরীর 
মাথায় তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে হাতে নিল সে 
একি! এযে রক্ত! --- চমকায় কি সে?
হে বেহায়া বিশ্ব মানব সভ্যতা !
হে অন্ধ বিশ্ব বিবেক রক্তের গন্ধ বিচলিত করে না ধ্বংসের এই রূপ ?
কি বীভৎস ! কি ভয়ংকর !
আশ্চর্য হয়ে ভাবি, কেন পারছিনা বলতে কিচ্ছুটি কাউকে
ক্ষোভ থৈ থৈ সমগ্র সত্তা নিমজ্জিত হয় গহীন সমুদ্দুর-
বারুদের গন্ধ - তাজা প্রাণের আর্তনাদ ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়ে রক্ত কণা
সর্বগ্রাসী যন্ত্রণা, অবসাদ, বিস্মরণ, কুচক্রী চাল গিলে খায় সময়।
প্রেমহীন শূন্য মহাকাশের তলে, বেদানার্ত পৃথিবী’পরে
আমি নির্বাক অশ্রুহীন চোখে স্থির অচঞ্চল
চোখের আগুনে দূর করতে চাই নিমজ্জত অন্ধকার সময় !!

শনিবার, ১৪ মে, ২০১৬

বোধ
......জীবনানন্দ দাশ
আলো-অন্ধকারে যাই__মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, __কোন এক বোধ কাজ করে!
স্বপ্ন নয়__শান্তি নয়__ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়!
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে;
সব কাজ তুচ্ছ হয়,__পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা__প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শূন্য মনে হয়!
সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে!
কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে
সহজ লোকের মতো! তাদের মতন ভাষা কথা
কে বলিতে পারে আর!__কোনো নিশ্চয়তা
কে জানিতে পারে আর?__শরীরের স্বাদ
কে বুঝিতে চায় আর?__প্রাণের আহ্লাদ
সকল লোকের মতো কে পাবে আবার!
সকল লোকের মতো বীজ বুনে আর
স্বাদ কই!__ ফসলের আকাঙ্ক্ষায় থেকে,
শরীরে মাটির গন্ধ মেখে,
শরীরে জলের গন্ধ মেখে,
উৎসাহে আলোর দিকে চেয়ে
চাষার মতন প্রাণ পেয়ে
কে আর রহিবে জেগে পৃথিবীর ’পরে?
স্বপ্ন নয়,__ শান্তি নয়,__কোন এক বোধ কাজ করে
মাথার ভিতরে!
পথে চলে পারে__পারাপারে
উপেক্ষা করিতে চাই তারে;
মড়ার খুলির মতো ধরে
আছাড় মারিতে চাই, জীবন্ত মাথার মতো ঘোরে
তবু সে মাথার চারিপাশে!
তবু সে চোখের চারিপাশে!
তবু সে বুকের চারিপাশে!
আমি চলি, সাথে সাথে সেও চলে আসে!
আমি থামি,__
সেও থেমে যায়;
সকল লোকের মাঝে বসে
আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা?
আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?
আমার পথের শুধু বাধা?
জন্মিয়াছে যারা এই পৃথিবীতে
সন্তানের জন্ম দিতে দিতে
যাহাদের কেটে গেছে অনেক সময়
কিংবা আজ সন্তানের জন্ম দিতে হয়
যাহাদের; কিংবা যারা পৃথিবীর বীজক্ষেতে আসিতেছে চলে
জন্ম দেবে__জন্ম দেবে বলে;
তাদের হৃদয় আর মাথার মতন
আমার হৃদয় না কি?__তাহাদের মন
আমার মনের মতো না কি?
__তবু কেন এমন একাকী
তবু আমি এমন একাকী!
হাতে তুলে দেখিনি কি চাষার লাঙল?
বালটিতে টানিনি কি জল?
কাস্তে হাতে কতবার যাইনি কি মাঠে?
মেছোদের মতো আমি কত নদী ঘাটে
ঘুরিয়াছি;
পুকুরের পানা শ্যালা__ আঁষটে গায়ের ঘ্রাণ গায়ে
গিয়েছে জড়ায়ে;
__এই সব স্বাদ;
__এ সব পেয়েছি আমি,__বাতাসের মতন অবাধ
বয়েছে জীবন,
নক্ষত্রের তলে শুয়ে ঘুমায়েছে মন
একদিন;
এই সব সাধ
জানিয়াছি একদিন,__অবাধ__অগাধ;
চলে গেছি ইহাদের ছেড়ে;__
ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে,
অবহেলা করে আমি দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে,
ঘৃণা করে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে;
আমারে সে ভালোবাসিয়াছে,
আসিয়াছে কাছে,
উপেক্ষা সে করেছে আমারে,
ঘৃণা করে চলে গেছে__যখন ডেকেছি বারেবারে
ভালোবেসে তারে;
তবুও সাধনা ছিল একদিন,__এই ভালোবাসা;
আমি তার উপেক্ষার ভাষা
আমি তার ঘৃণার আক্রোশ
অবহেলা করে গেছি; যে নক্ষত্র__নক্ষত্রের দোষ
আমার প্রেমের পথে বারবার দিয়ে গেছে বাধা
আমি তা ভুলিয়া গেছি;
তবু এই ভালবাসা__ধুলো আর কাদা__।
মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়__প্রেম নয়__কোনো এক বোধ কাজ করে।
আমি সব দেবতারে ছেড়ে
আমার প্রাণের কাছে চলে আসি,
বলি আমি এই হৃদয়েরে :
সে কেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়!
অবসাদ নাই তার? নাই তার শান্তির সময়?
কোনোদিন ঘুমাবে না? ধীরে শুয়ে থাকিবার স্বাদ
পাবে না কি? পাবে না আহ্লাদ
মানুষের মুখ দেখে কোনোদিন!
মানুষীর মুখ দেখে কোনোদিন!
এই বোধ__শুধু এই স্বাদ
পায় সে কি অগাধ__অগাধ!
পৃথিবীর পথ ছেড়ে আকাশের নক্ষত্রের পথ
চায় না সে?__করেছে শপথ
দেখিবে সে মানুষের মুখ?
দেখিবে সে মানুষীর মুখ?
দেখিবে সে শিশুর মুখ?
চোখে কালোশিরার অসুখ,
কানে যেই বধিরতা আছে,
যেই কুঁজ__গলগণ্ড মাংসে ফলিয়াছে
নষ্ট শসা__পচা চালকুমড়ার ছাঁচে,
যে সব হৃদয়ে ফলিয়াছে
__সেই সব।

শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৫

সৃজনশীলতার চেতনা......

দেশে এখন সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান করা হচ্ছে, এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে এর উল্টোটাই ঘটছে। আবার এ পদ্ধতিতে গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীলতা কমার কথা থাকলেও বৈপরীত্যমূলক ব্যাপার হচ্ছে, গাইডের ওপর নির্ভরশীলতা আরও বেড়েছে। এ ব্যাপারে অভিভাবকেরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই লেখায় হাত দেওয়া।
জাতিসংঘের ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটসের ২৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘সবারই শিক্ষা লাভের অধিকার আছে।’ মানবিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষার বিকল্প নেই। আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে না পারলে আমরা বিশ্বায়িত পৃথিবীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব না। এ লক্ষ্যেই সৃজনশীল পদ্ধতি প্রণয়ন করা হয়েছে।
সৃজনশীল পদ্ধতির মাজেজা হচ্ছে শিক্ষণ, পরীক্ষা নয়। এ পদ্ধতির লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করার মতো নিদারুণ ও নিষ্ফলা পরিশ্রমের হাত থেকে রেহাই দেওয়া। ফলে এ পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে সেটা তেমন জনপ্রিয় হচ্ছে না। তার কারণ হলো, সেটা করার জন্য আমাদের যে প্রস্তুতি প্রয়োজন, আমরা সেটা নিতে পারিনি। এই পদ্ধতিতে শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন হওয়ার কথা। কিন্তু সে ব্যবস্থা করা আমাদের দেশে কবে সম্ভব হবে, তা বলা মুশকিল। ফলে এখনো পাবলিক পরীক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
সৃজনশীল প্রশ্নকে চারটি অংশে ভাগ করা হয়েছে: জ্ঞান, অনুধাবন, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা। এই চারটি অংশের উত্তর থেকে ছাত্রছাত্রীদের স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাক্ষমতার বিভিন্ন স্তর যাচাই করা সম্ভব। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাইয়ীদের মতে, ‘প্রশ্নের চতুর্থ অংশে যাচাই করে দেখা হয় ওই অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত পাঠ্যবইয়ের জায়গাটুকু ও উদ্দীপকের ভেতরকার ভাবনাচিন্তা, অনুভূতি-কল্পনাশক্তি, গভীরতা-ব্যাপকতা ইত্যাদিকে ছাত্রছাত্রীরা তুলনা করে বুঝতে পারছে কি না; এদের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য, উচিত-অনুচিত, ভালো-মন্দ ইত্যাদি বিচার-বিবেচনা করে তার নিজস্ব মতামত গড়ে তুলতে পারছে কি না।’
ইংরেজি আমাদের মাতৃভাষা নয়, বিদেশি ভাষা। প্রাথমিক স্তরে বিদেশি ভাষা শেখানোর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ফলে ইংরেজির সৃজনশীল প্রশ্ন কেমন হবে, তা নিয়ে আমাদের বিস্তর চিন্তার অবকাশ আছে। কিন্তু সেটা না করে সমাপনীর নম্বর বিন্যাস করা হয়েছে এভাবে: সিন ৫০, আনসিন ৫০। ভাবখানা এমন, যেন ইংরেজি আমাদের মাতৃভাষা। রাজধানী বা বড় শহরের সচ্ছল বাবা-মায়ের সন্তানেরা ভালো স্কুলে পড়ে, সেখানে ভালো শিক্ষকও আছেন। আবার তাদের প্রাইভেট টিউটরও আছে। ফলে তারা হয়তো এই ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, কিন্তু মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের গরিব মানুষের সন্তানদের কী হবে, সেটা কি আমরা ভেবে দেখেছি? প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভাষ্য হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের কাছে ইংরেজি আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষকই বলছেন, গণিত ও ইংরেজিকে সৃজনশীল পদ্ধতির বাইরে রাখা উচিত। কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো, এত কিছুর পরও কিন্তু পরীক্ষার ফল খারাপ হচ্ছে না। তার মানে কি ভূতটা সর্ষেতেই আছে?
আবার কমিউনিকেটিভ ইংরেজির নামে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ব্যাকরণ পড়ানো হচ্ছে না, এমনকি সাহিত্যও নয়। সাহিত্য না পড়লে কি ভাষা শেখা সম্ভব?
প্রাথমিক শিক্ষার হার বেড়েছে—শুধু এ নিয়ে আমাদের এখন আর গর্ব করার অবকাশ নেই। সময় এসেছে, সামনে এগোতে হবে, শিক্ষার মানোন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে, শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি ও যুক্তিবোধ শাণিত করতে হবে
সমস্যা হচ্ছে, সৃজনশীল পদ্ধতি প্রয়োগ করার আগে আমাদের যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া দরকার ছিল, সেটা আমরা নিতে পারিনি। সব শিক্ষককে এখন পর্যন্ত প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। আবার যাঁরা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তাঁরা যে প্রশিক্ষণলব্ধ শিক্ষা শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করছেন, সেটাই বা কে দেখছে। আগের পদ্ধতির সঙ্গে যে এ পদ্ধতির মৌলিক তফাত রয়েছে, সেটা ভুলে গেলে চলবে না। সৃজনশীলের মূল কথা হচ্ছে শিক্ষণ। ফলে পুরো প্রস্তুতি না নিয়ে হুট করে এই পদ্ধতি চালু করে দেওয়া কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্ন তোলার সময় হয়েছে।
মোদ্দা কথা হলো, সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষকদের সবচেয়ে বেশি সৃজনশীল হতে হবে। সেটা নিশ্চিত না করে এ ব্যবস্থা প্রবর্তন করলে তো হবে না। শিক্ষকেরা যাতে সৃজনশীল পদ্ধতির প্রশ্ন নিজে প্রণয়ন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করেছে। আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, বাজার অথবা গাইড থেকে নমুনা প্রশ্ন নিয়ে পাবলিক কিংবা স্কুলের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার প্রশ্ন করা যাবে না। অথচ খোদ এসএসসি পরীক্ষাতেই গাইড বই থেকে হুবহু প্রশ্ন তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োগের এই ঘাটতির কারণে গাইড বই ও কোচিং সেন্টারের আরও বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। তার চেয়েও বড় চিন্তার কারণ হচ্ছে প্রশ্নপত্র ফাঁস। অভিযোগ উঠেছে, এই ফাঁসের সঙ্গে কোচিং সেন্টারগুলো জড়িত। ওদিকে ভালো ছাত্রদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করার মতো সরকার তো কিছু করছেই না, উল্টো অষ্টম পে–স্কেলে সরকার শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন করেছে।
আরেকটি ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। একদিকে আমরা শিক্ষণকে মূল মন্ত্র বলব, আরেক দিকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অযাচিত পরীক্ষার চাপে ফেলব, তা হতে পারে না। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার কথা ছিল না, কিন্তু আমরা তাতে কর্ণপাত না করে শিক্ষার্থীদের জীবনে আরেকটি পাবলিক পরীক্ষা যোগ করেছি, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সারা দিন দৌড়ের ওপর রাখার ব্যবস্থা করেছি। তবে এতে আর কেউ লাভবান না হলেও কোচিং সেন্টারগুলো লাভবান হচ্ছে; কারণ স্কুলে পড়াশোনা হয় না, তাই কোচিং সেন্টারে না গেলে পড়া হবে কী করে? অনেক বাবা-মায়েরই তো পড়ানোর সময় নেই। এই অযাচিত চাপে পড়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে, সেটা কি আমরা ভেবে দেখছি? তবে আশার কথা হচ্ছে, শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ২০১৮ সাল থেকে প্রাথমিক সমাপণী পরীক্ষা থাকবে না। মন্ত্রীর এ বক্তব্য যেন কথার কথা না হয়।
প্রাথমিক শিক্ষার হার বেড়েছে—শুধু এ নিয়ে আমাদের এখন আর গর্ব করার অবকাশ নেই। সময় এসেছে, সামনে এগোতে হবে, শিক্ষার মানোন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে, শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি ও যুক্তিবোধ শাণিত করতে হবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সিইও সরবরাহকারী দেশ। অর্থাৎ পৃথিবীর বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে যাঁরা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও হিসেবে কাজ করছেন, তাঁদের সিংহভাগই ভারতীয়। আর আমরা এখনো বিদেশে শ্রমশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যা নিয়ে গর্ব করছি। আবার সেই শ্রমিকেরা ইংরেজি না জানার কারণে বিদেশে নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই হচ্ছে আমাদের শিক্ষার হাল!
তবে এত কিছু বলার মানে কিন্তু এই নয় যে সৃজনশীল পদ্ধতি বাদ দিতে হবে। কথা হচ্ছে, সৃজনশীল পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করার জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে, স্ববিরোধগুলো দূর করতে হবে।